| নুরুল আমিন
জীবনের বসন্ত পেরিয়ে গেলে নেমে আসে প্রবীণকাল। এক সময় যে মানুষটি সংসারের হাল ধরেছিল, যার উপর নির্ভর ছিল সবাই। যে ছিল পরিবারের সর্বেসর্বা, সময়ের ব্যবধানে সে হয় কর্মহীন অক্ষম একজন প্রবীণ মানুষ। কেউ কখনো বুড়ো হতে চায়না। কিন্তু জীবনের নিয়মে মানুষ এক সময় বুড়ো বা প্রবীণ হয়ে যায়। সাধারণত কারো বয়স ষাট বছর কিংবা এর বেশি হলে তাকে প্রবীণ বলা হয়। আমাদের আশেপাশে অনেক সংসারে বুড়ো মানুষ রয়েছে। বুড়ো মানুষদের শারীরিক শক্তি কমে যায়। দুর্বল হয়ে পড়ে। লাঠি ভর দিয়ে চলতে হয়। উপার্জন করতে পারেনা। অপরদিকে বার্ধক্যজনিত নানান অসুখ-বিসুখ দেখা দেয়। এক সময়ের টগবগে তাজা তরুণ জীবনের অন্তিম বেলাভূমে এসে অসহায় হয়ে পড়ে। প্রবীণ ব্যক্তি চলাফেরা, উঠাবসা, খাওয়া-দাওয়া, চিকিৎসা ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে অন্যের উপর নির্ভর হয়ে পড়ে।
সমাজের অনেকেই প্রবীণদেরকে গুরুত্ব দেয় না।প্রবীণদেরকে এড়িয়ে চলে। সংসারের বোঝা মনে করে। অবহেলা করে। সেবাযত্ন ও চিকিৎসা করেনা। প্রবীণদের সাথে কর্কশ ব্যবহার ও বিদ্রুপ করেন। ফলে প্রবীণ ব্যক্তি সম্বলহীন হয়ে পড়ে। তার দীর্ঘশ্বাস বেড়ে যায়। কখনোই কাম্য নয়।
শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে মানুষের জীবনধারা পরিবর্তনের ঘটে। অনেক সময় সমাজ ও পরিবারে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে। দারিদ্র্যতা, হীনমন্যতা ও পারিবারিক ভাঙ্গনের কারনে প্রবীণরা বিরুপ প্রভাবের শিকার হন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পারিবারিক অবহেলা ও অবজ্ঞার কারনে বার্ধক্যের অসহায়ত্বকে সঙ্গে নিয়ে জীবিকার সন্ধ্যানে প্রবীণকে যেতে হয় বৃদ্ধাশ্রমে। অনেকে আবার ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নেয়। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে - এ সমাজ, সংসার ও দেশ প্রবীণদের কাছে কৃতজ্ঞ।
কারণ যৌবনে মেধা, শ্রম, ত্যাগ ও অর্থ দিয়ে এ প্রবীণ ব্যক্তিরা ভুমিকা রেখেছিল। তবে এখনো প্রবীণদেরকে যথার্থ মূল্যায়ন করা হলে তারা তাদের বুদ্ধি, পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদেরকে উন্নয়ন কর্মকান্ডে সহায়তা করতে পারেন। সঠিক ও সুন্দর পথ দেখাতে পারেন। তাই বলা যায় - প্রবীণরাও আমাদের মানব সম্পদ। প্রবীণদের প্রতি আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের উচিত তাদের মূল্যায়ন করা। আমাদের প্রতি তাদের অধিকার রয়েছে। প্রবীণদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা ঠিক নয়। সমাজ বা রাষ্ট্রে বিভিন্ন অধিকার যেমন - নারী অধিকার, শিশু অধিকার, শ্রম অধিকার ইত্যাদি অধিকারের মত প্রবীণ অধিকার থাকা দরকার। প্রবীণ অধিকার আদায় ও বাস্তবায়নের প্রতি আমাদের সচেতন হওয়া উচিত।
প্রবীণের পাশে থাকা এবং সহযোগিতা করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। সাধারণত সংসারে মা-বাবা প্রবীণ। এরাই এ পৃথিবীতে আমাদের আগমনের উৎস। মা-বাবা ব্যতীত এ ভব সংসারে আমাদের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায়না। এছাড়া সমাজে তথা আমাদের আত্মীয় স্বজনদের মধ্যেও কিছু প্রবীণ ব্যক্তি রয়েছেন। মা-বাবা তথা প্রবীণদের প্রতি সব সময় সহনশীল থাকতে হবে। তাদের সাথে নম্র ভদ্র ব্যবহার করতে হবে। তাদেরকে কোন প্রকার কষ্ট দেওয়া যাবেনা। তাদের প্রতি সবসময় সুনজর রাখতে হবে। অসুখ বিসুখ হলে চিকিৎসা করাতে হবে। তাদের সেবাযত্ন ও খেদমত করতে হবে। তাদের মতামতের প্রাধান্য দিতে হবে।
প্রবীণদের পাশে বসে গল্প গুজব করে নিঃসঙ্গতা দুর করতে হবে। প্রবীণদের খাদ্য, গোসল ও পোশাক পরিচ্ছদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। কখনো তাদের সাথে রাগ বা অভিমান করা ঠিক হবেনা। পথে ঘাটে কোন প্রবীণ মুরুব্বির সাথে দেখা হলে তাকে সম্মান করতে হবে। চলাফেরায় তার কোন অসুবিধা হলে তাকে সহযোগিতা করা কর্তব্য। প্রবীণদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তাদেরকে সমাজ ও পরিবারে অপ্রয়োজনীয় না ভেবে বরং যথেষ্ট গুরুত্ব ও মর্যাদা দিতে হবে। দেশের নাগরিক হিসাবে প্রবীণদের জন্য সরকারকে সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে এবং তাদের অধিকারের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক, লালমোহন, ভোলা।
nurulamin911@gmail.com
|